বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৮:১২ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজন অন্যরকম অধিদপ্তর

মাতৃভূমি সংবাদ 

রিপোর্টারঃ হাবিবুর রহমান

বর্তমানে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ। অবশ্য এ মর্যাদা ২০১৮ সালে পেয়েছি। ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্যে ১০০ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রীর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে এবং ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশের কাতারে থাকব ইনশা আল্লাহ। একটি কথা অন্তত জানা দরকার, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা উন্নত হলে সভ্যতার উন্নয়ন করাটাও জরুরি। সেই সঙ্গে উন্নয়নটাও টেকসই হওয়া দরকার। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে এবং উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে মানবসম্পদকে সুদক্ষ, মার্জিত ও সভ্য করে গড়ে তুলতে হবে। অবশ্য এ কাজে সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে ২০৪১ সালের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন এবং ২০২৩ সাল থেকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু করেছে।২০২৫ সালের মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শ্রেণি এবং ২০২৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি এ কারিকুলামের আওতায় আসবে। আশা করছি, ২০৩০ সাল নাগাদ এ কারিকুলামের মাধ্যমে আমরা অভিজ্ঞতা অর্জিত শিক্ষার্থী আমাদের কর্মক্ষেত্রে পাব। আর এ অভিজ্ঞতাভিত্তিক কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করছে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং সর্বোপরি মাঠপর্যায়ে কর্মরত শিক্ষক শ্রেণি।নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা দরকার—১. বিদ্যমান অবকাঠামোয় এই কারিকুলাম বাস্তবায়ন অবশ্যই সম্ভব বলে মনে করি। দেশে বিদ্যালয়ে যে পরিমাণ বিল্ডিং হয়েছে, সেগুলোকে আন্তরিকতা দিয়ে ব্যবহার করলে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা নয়। শুধু একটু পরিকল্পনা নিলেই এবং কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য সরকার কিছু বরাদ্দ দিলে বিদ্যমান অবকাঠামোয় সুষ্ঠু–সুন্দরভাবে এ কারিকুলাম বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে খেয়াল করলাম যে এখানে শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের মানবিক ও নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন হতে হবে। শিক্ষকদের আরও আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষার জন্য সহায়ক উপকরণগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরবরাহ করবে। আর উপকরণগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে (শ্রেণিকক্ষে) থাকলে তারা স্বাধীনভাবে বিদ্যালয়ে নিজেদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাগুলো অর্জন করতে পারবে। তবে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘসময় বিদ্যালয়ে রেখে শিখন অভিজ্ঞতাগুলো অর্জন করাতে গেলে টিফিন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা জরুরি। বিদ্যালয়ে আমরা যে টিফিন দিচ্ছি তাতে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদার খুব সামান্যই পূরণ হচ্ছে। কার্যত টিফিনের নামে শিক্ষার্থীদের যেটা দিচ্ছি, সেটা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকার করছে? কারণ, বর্তমান যে বাজারব্যবস্থা, তাতে জনপ্রতি দৈনিক তিন থেকে চার টাকার টিফিনে একজন শিক্ষার্থীকে কতটা ভালো টিফিন দেওয়া সম্ভব?২. স্বল্প সুযোগ-সুবিধা ও নিম্ন আর্থসামাজিক মর্যাদায় একজন শিক্ষককে দিয়ে এ কারিকুলাম বাস্তবায়ন কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা সত্যিই একটি বড় প্রশ্ন? শিক্ষকেরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে কতটা দুর্বল, তা শিক্ষকদের দিকে তাকালে সহজেই যে কেউ বুঝতে পারবেন। শিক্ষকদের দুর্দশার কথাগুলো এর আগেও কয়েকবার বলতে চেষ্টা করেছি, এখনো বলছি। শিক্ষকদের বেতন, পদোন্নতি বা অবসর–পরবর্তী সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা কোনোটাই যেসব দেশ থেকে কারিকুলাম আনা হয়েছে, সে সব দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শুনেছি আরও ৫১টি দেশ এই কারিকুলাম চালু করেছে। ওই ৫১টি দেশের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা আর আমাদের দেশের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা তুলনা করে দেখতে কারিকুলাম আনয়নকারী কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি। কারণ, প্রেষণা থিওরি অনুযায়ী নিম্ন সুযোগ–সুবিধা নিম্ন প্রেষণার সৃষ্টি করে, ফলে শিক্ষকদের নিম্ন কর্মস্পৃহা সৃষ্টি হবে এবং ফলস্বরূপ নিম্নমানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে উঠবে। তাই নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে গেলে শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এ ছাড়া শিক্ষকতা পেশায় উচ্চ মেধাবীদের নিয়োগ ও ধরে রাখতে আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো এবং নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ থাকতে হবে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি সুস্পষ্ট মতবাদ আছে, কর্মে নিযুক্ত কোনো কর্মীর পূর্ণ মানুষিক পরিতৃপ্তির ওপর তার কাজের সফলতা নির্ভর করে।৩. শিক্ষার্থী ভর্তি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন না করলে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন জটিল হতে পারে। লটারি সিস্টেমে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থী এক শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কারণে সবাই সমানভাবে শিখন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছে না। সুতরাং শিক্ষার সব স্তরে ও সব প্রতিষ্ঠানে একই ভর্তি পদ্ধতি চালু করা জরুরি।৪. শিক্ষকদের সুযোগ–সুবিধা নিয়ে বললে এমপিওভুক্ত একজন সহকারী শিক্ষকের বেতন ১২,৫০০ টাকা আর বাড়িভাড়া ১০০০ টাকা, মেডিকেল ৫০০ টাকা, যা অত্যন্ত হাস্যকর। আর সরকারি হাইস্কুলে একজন সহকারী শিক্ষকের বেতন শুরু হয় ১৬ হাজার টাকা (দ্বিতীয় শ্রেণি/ ১০ম গ্রেড) সঙ্গে বাড়িভাড়া ও মেডিকেল যুক্ত থাকে। আর একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের মূল বেতন ১১,০০০/- টাকা (১৩তম গ্রেডে) সঙ্গে বাড়িভাড়া ও মেডিকেল যুক্ত থাকে। আর সব ক্যাটাগরির শিক্ষকের পাওনা থেকে কিছু অংশ কেটে রাখা হয় ভবিষ্যতে কিছু আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য। সবকিছু বাদ দিয়ে শেষে একজন শিক্ষক যা পান, তাতে কীভাবে তিনি পরিবারের ব্যয়ভার বহন করছেন? আর এ আর্থিক অশান্তির মধ্যে তিনি কতটা মনোযোগ দিয়ে শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন? পরিস্থিতি এমন যে শিক্ষকদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এ অবস্থায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা তো একটু সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধির জন্য (জাতীয়করণের) আন্দোলন করছেন। সরকারের আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের প্রয়োজন।আর সরকারি মাধ্যমিকে কর্মরত প্রায় তিন হাজার শিক্ষকের ২০১৫ সালে জাতীয় পে-স্কেলের আগের বকেয়া টাইম স্কেল সিলেকশন গ্রেড আদালতের রায় অনুযায়ী প্রদান না করার ফলে শিক্ষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারি কলেজের ন্যায় মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারিকরণ স্কুলের জন্য একটি যৌক্তিক আত্তীকরণ বিধিমালা প্রণয়ন না করার কারণে সরকারি মাধ্যমিকে কর্মরত শিক্ষকদের স্বার্থ এবং মর্যাদা হ্রাস পাচ্ছে বলে সরকারি মাধ্যমিকে কর্মরত শিক্ষক–কর্মকর্তারা মনে করেন। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের সরকারি কলেজের মতো চার স্তরের গ্রেডভিত্তিক (চেয়ারভিত্তিক সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি প্রথা বাতিল করে) পদোন্নতি প্রথা চালু না করার কারণে (School & Inspection Branch) কর্মরত শিক্ষক–কর্মকর্তাদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে। তাই সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষকদের বর্তমান পদমর্যাদার আপগ্রেডেশন করা অর্থাৎ এন্ট্রি পদ ৯ম গ্রেড ধরে সরকারি কলেজের মতো চার স্তরের পদসোপান (Career Path) প্রণয়ন এবং নিয়মিত পদোন্নতি প্রথা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এ চার স্তরীয় পদসোপান বাস্তবায়িত হলে মাধ্যমিকের কর্মরত শিক্ষক–কর্মকর্তাদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে যে বঞ্চনা, তার প্রায় ৯৫ ভাগ সমস্যার সমাধান হবে বলে মাধ্যমিকে কর্মরত শিক্ষক–কর্মকর্তারা মনে করেন। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পদ–পদবি আপগ্রেড করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা মেনে ইতিমধ্যে বিভিন্ন দপ্তর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদনাম পরিবর্তন করেছে এবং পদের আপগ্রেডেশন চলমান।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

© All rights reserved © 2023 MatrivumiSongbad
Design & Developed BY N Host BD